পোস্ট মর্টেমঃ- প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা - ২০১৯ - জীবন গড়ি প্রযুক্তির সুরে ♫

Post Top Ad

পোস্ট মর্টেমঃ- প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা - ২০১৯

পোস্ট মর্টেমঃ- প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা - ২০১৯

Share This



এ নিয়োগ বিধিমালা কার্যকর হওয়ার সাথে সাথেই পূর্বের নিয়োগ বিধিমালা অকার্যকর হয়ে গেছে।  প্রধান শিক্ষক পদে প্রমোশনের ক্ষেত্রে  নিয়োগ বিধিমালায় বলা হয়েছে ”সহকারী শিক্ষক পদে প্রশিক্ষণসহ অন্যূন ০৭ (সাত) বৎসরের চাকুরী।” এবং  সহকারী শিক্ষক নিয়োগ যোগ্যতা চাওয়া হয়েছে ”কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় হইতে দ্বিতীয় শ্রেণি বা সমমানের সিজিপিএসহ স্নাতক  বা স্নাতক  (সম্মান) বা সমমানের ডিগ্রী।”  প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, সাত বছর সহকারী শিক্ষক হিসেবে কাজ করলে কারা প্রমোশন পাবেন? এসএসসি/এইচএসসি পাশ মহিলা শিক্ষকরা কি প্রমোশনের আওতায় আসবেন?



বাংলাদেশে যত মন্ত্রণালয় রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি লোকবল রয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রণালয়ে। শুধু শিক্ষককের সংখ্যাই প্রায় সাড়ে তিনলাখ। বেশি জনবল থাকায় সমস্যারও অন্ত নেই। শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালায় নারী ও পুরুষ শিক্ষক নিয়োগ যোগ্যতায় বৈষম্য, প্রমোশনের দীর্ঘসূত্রিতা, প্রধান শিক্ষকদের সাথে সহকারী শিক্ষকদের বেতন বৈষম্যসহ নানাবিধ সমস্যা রয়েছে। বেতন বৈষম্য এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার শিক্ষাগত যোগ্যতা একই করার জন্য একটি যুগোপযোগি প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালার প্রয়োজন দেখা দেয়। আর এসব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেই অতি সম্প্রতি প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা ২০১৯ প্রণয়ন করা হয়।

৪ঠা এপ্রিল ২০১৯ তারিখে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা ২০১৯ প্রকাশিত হয়েছে। দীর্ঘদিন  যাবৎ এ নিয়োগ বিধিমিালার অপেক্ষায় ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। অবশেষে তাদের এই কাঙ্খিত বিধিমালার দেখা পেলেও তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। এ বিধিমালার সাথে ২০১৩ সালের প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালার তেমন কোন প্রার্থক্য পরিলক্ষিত হয়নি। এ নিয়ে ফেসবুকে শিক্ষকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে যাচ্ছেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে আগের বিধিমালায় মহিলারা এইচ এস সি পাশ ছিল এবং পুরুষদের  শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল স্নাতক পাশ। এক্ষেত্রে পুরুষ সহকারী শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছিলেন যেন নতুন বিধিমালায় পুরুষ ও মহিলাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক পাশ করা হয় এবং নারী কোটা ৬০% থেকে কমিয়ে ৩০% করা হয়। কিন্তু তাদের প্রথম দাবিটি অর্থাৎ নারী পুরুষ উভয়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক করা হয়েছে নতুন বিধিমালায়। তাছাড়া আগের বিধিমালায় সরাসরি প্রধান শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়স ছিল ২৫-৩৫ বছর। কিন্তু এখন এটা করা হয়েছে ২১-৩০ বছর। প্রমোশনের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে সহকারী শিক্ষক পদে প্রশিক্ষণসহ অন্যূন ০৭ (সাত) বৎসরের চাকুরী। বাকি অংশটুকু ২০১৩ সালের শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালার ছায়ালিপিই বলা যায়।

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ডিপার্টমেন্ট একটা আজব ডিপার্টমেন্ট বলা চলে। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধান সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হয় না।  প্রমোশনের মাধ্যমে এ পদে পদায়িত করা হয়।কিন্ত আগের বিধিমালার মতো বর্তমান বিধিমালায়ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩৫% প্রধান শিক্ষক সরাসরি নিযোগপ্রাপ্ত হোন। এ নিয়ে সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে চাঁপা ক্ষোভ ছিল। তারা দাবি জানিয়ে আসছিলেন নতুন বিধিমালায় প্রধান শিক্ষক পদে যেন শতভাগ প্রমোশনের মাধ্যমে নিয়োগ প্রদান করা হয়।  কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এ দাবিটি উপেক্ষিতই থেকে গেল। বর্তমানে  প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিন যোগ্যতার সহকারী শিক্ষক রয়েছেন। ২০১৩ সালের আগে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মহিলাদের যোগ্যতা চাওয়া হত এসএসসি পাশ। ২০১৩ সালে এটি পরিবর্তন করে মহিলাদের যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয় এইচএসসি। ২০১৯ সালের বিধিমালায় মহিলা পুরুষ নির্বিশেষে নিয়োগ যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে ‘‘কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় হইতে দ্বিতীয় শ্রেণি বা সমমানের সিজিপিএসহ স্নাতক বা স্নাতক (সম্মান) বা সমমানের ডিগ্রী। ”প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে এসএসসি বা এইচএসসিতে তৃতীয় বিভাগ ধারীরা কি সহকারী শিক্ষক পদে আবেদনের যোগ্য হবেন? এসএসসি বা এইচএসসিতে যদি কেহ তৃতীয় বিভাগধারী হয় কিন্তু স্নাতকে  দ্বিতীয় বিভাগ পেলে সে কী আবেদনের যোগ্য হবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আলোচ্য শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালায় অনুপস্থিত রয়েছে।

 এ নিয়োগ বিধিমালা কার্যকর হওয়ার সাথে সাথেই পূর্বের নিয়োগ বিধিমালা অকার্যকর হয়ে গেছে।  প্রধান শিক্ষক পদে প্রমোশনের ক্ষেত্রে  নিয়োগ বিধিমালায় বলা হয়েছে ”সহকারী শিক্ষক পদে প্রশিক্ষণসহ অন্যূন ০৭ (সাত) বৎসরের চাকুরী।” এবং  সহকারী শিক্ষক নিয়োগ যোগ্যতা চাওয়া হয়েছে ”কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় হইতে দ্বিতীয় শ্রেণি বা সমমানের সিজিপিএসহ স্নাতক  বা স্নাতক  (সম্মান) বা সমমানের ডিগ্রী।”  প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, সাত বছর সহকারী শিক্ষক হিসেবে কাজ করলে কারা প্রমোশন পাবেন? এসএসসি/এইচএসসি পাশ মহিলা শিক্ষকরা কি প্রমোশনের আওতায় আসবেন? নিয়োগ বিধিমালায় এ বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়নি। অনেকেই বলছেন এসএসসি/এইচএসসি পাশ শিক্ষকরা অবশ্যই প্রমোশন পাবেন। তাদের যুক্তি হল নিয়োগ বিধিতে তো বলা হয়েছে প্রশিক্ষণসহ (সিইনএড/ডিপিএড) সাত বছরের অভিজ্ঞতা । আরেক পক্ষ বলছেন, নতুন বিধিমালায় সহকারী শিক্ষকরে যোগ্যতা চাওয়া হয়েছে ২য় শ্রেণির স্নাতক । সুতরাং ২য় শ্রেণির স্নাতক  ছাড়া কোন সহকারী শিক্ষক প্রমোশনের যোগ্য হবেন না। এখানে আরেকটি প্রশ্ন হচ্ছে, যারা এসএসসি বা এইচএসসিতে তৃতীয় বিভাগে পাশ করেছেন কিন্তু স্নাতকে দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেছেন তারা প্রমোশন পাবেন কিন্তু যারা এসএসসি বা এইচএসসি তে তৃতীয় বিভাগ পান নাই কিন্তু স্নাতকে তৃতীয় বিভাগে পাশ করে শিক্ষকতায় এসেছেন তারা কেন প্রমোশন থেকে বঞ্চিত হবেন?

এ বিধিমালা প্রণয়নের আগেই প্রায় বিশ হাজার সহকারী শিক্ষককে প্রধান শিক্ষক পদে  চলতি দায়িত্ব দিয়ে পদায়ন করা হয়েছে; যার বেশিরভাগ মহিলারাই এইচএসসি পাশ। এছাড়া স্নাতক  পাশ যারা রয়েছেন তাদের অধিকাংশই তৃতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ। চলতি দায়িত্ব মানে প্রমোশন নয়। বর্তমান নিয়োগ বিধিমালা কার্যকর হলে চলতি দায়িত্বপ্রাপ্তরা কি স্বপদে বহাল থাকবেন না সহকারী শিক্ষক পদে  আবার ফিরে আসবেন, এ নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় আছেন। বর্তমান বিধিমালা অনুসারে দ্বিতীয় বিভাগ/শ্রেণিতে  স্নাতক  পাশরাই প্রধান শিক্ষক পদে প্রমোশনের যোগ্য বলে মনে হচ্ছে। বিধিমালায় বিষয়টি স্পষ্ট না করায় এসএসসি/এইচএসসি পাশরা এবংস্নাতক তৃতীয় বিভাগ প্রাপ্তরা আইনি লড়াইয়ে আবতীর্ণ হওয়াটা স্বাভাবিক। ফলে আগের মতো প্রধান শিক্ষকবিহীন হয়ে পড়তে পারে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো।
বর্তমান নিয়োগ বিধিমালায় প্রধান শিক্ষকরা সবচেয়ে বেশি নাখোশ। তারা বলছেন, এ নিয়োগ বিধিমালায় তাদের প্রমোশন সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। প্রধান শিক্ষক পদটি একটি ব্লক পোস্ট। এ পদ থেকে প্রমোশনের সুযোগ নেই। তারা দীর্ঘদিন থেকে বলে আসছিলেন প্রধান শিক্ষকদের প্রমোশন দিয়ে যেন সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার এবং সহকারী ইউআরসি ইন্সট্রাক্টর করা হয়। প্রধান শিক্ষক পদটিকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করায় এ পদে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষমতা পিএসসির হাতে চলে যায়। প্রাথমিক শিক্ষার টালমাটাল অব্যবস্থাপনা থেকে শৃংঙ্খলায় নিয়ে আসার জন্য পিএসসির উচিৎ অতি দ্রুত সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার এবং সহকারী হন্সট্রাক্টর নিয়োগ বিধিমালা সংশোধন করে শতভাগ পদে  বিভাগীয় পরীক্ষার মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক পদ থেকে নিয়োগ প্রদান করা।
প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে সকল শিক্ষার ফাউন্ডেশন বা ভিত্তি। এ শিক্ষায় নিয়োজিত শিক্ষকদের প্রতি নজর দিতে হবে। শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষকের মান দিতে হবে। তাদের  সমস্যাগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিরসনের উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা প্রণয়নে শিক্ষকদের প্রতিনিধি রাখলে বিধিমালা নিয়ে হয়তো প্রশ্ন উঠতো না। শিক্ষা এবং শিক্ষক সংশ্লিষ্ট কাজে শিক্ষকদের রাখা উচিৎ। শিক্ষকদের সাথে আলোচনা এবং বিধিমালার অস্পষ্টতা নিরসন করে এ বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হোক। শিক্ষার কাঙ্খিত মানের সাথে শিক্ষকের মান মর্যাদার বিষয় জড়িত। এসব বিষয়কে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিতে হবে। 

পরিশেষে “শিক্ষকদের মর্যাদার জয় হোক।”

আজাদ মিয়া
প্রাথমিক শিক্ষক ও কলামিস্ট
মোবাইল নং- ০১৭১৭৬৫২২৩১
ইমেইলঃ phehli@gmail.com

No comments:

Post a Comment

Post Bottom Ad

Pages