ঢাল তলোয়ারবিহিন প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি - জীবন গড়ি প্রযুক্তির সুরে ♫

Post Top Ad

ঢাল তলোয়ারবিহিন প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি

ঢাল তলোয়ারবিহিন প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি

Share This


বর্তমান শিক্ষানীতির আলোকে প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণিতে উন্নীত করা নিঃসন্দেহে বর্তমান সরকারের একটি সাহসী পদক্ষেপ। দারিদ্র মুক্ত স্বনির্ভর একটি জাতির পুর্বশর্ত হচ্ছে শিক্ষা। আর শিক্ষার মুল ভিত্তি হল প্রাথমিক শিক্ষা। বাংলাদেশ স্বাধীনের পর জাতির জনকের নির্দেশে তৎকালীন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ কুদরাত-ই খোদার নেতৃত্বে যে শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়, সেই কমিশনকে কুদরাত-ই খোদাশিক্ষা কমিশন নামে অভিহিত করা হয়। সেই কমিশনের রিপোর্টে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা স্তরকে অষ্টম শেণিতে উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়েছিল।কিন্তু সেটা আটটি শিক্ষা কমিশন হয়।সবগুলো কমিশনই প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণিতে উন্নীত করার সুপারিশ করে কিন্তু সেসব সুপারিশ আলোর মুদেখেনি।রাজনৈতিক অস্থিরতা বা অনিচ্ছার কারণে সেগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। সর্বশেষ বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ কবির চৌধুরীর নেতৃত্বে শিক্ষা নীতি ২০০৯ প্রণীত হয়। এই শিক্ষানীতি ও আগের শিক্ষা কমিশনগুলোর আলোকে প্রাথিমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণিতে উন্নীত করার সুপারিশ করে। বর্তমান সরকার এই শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণিতে উন্নীত করণের লক্ষ্যে ২০১৩ সালে প্রায় ৪৯১ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণি চালু করেন। ২০১৪ ‍সালে ১৯২টি, ২০১৫ সালে ৭৭ টি, ২০১৬ সালে ৪টি সহ মোট ৭৬৪ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি চালু আছে। আরো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ-৮ম শ্রেণি চালু প্রক্রিয়াধীন আছে।বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে এই উদ্যোগটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। কিন্তু এমন একটি ভাল পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করার জন্য প্রয়োজনীয় কোন পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। বিষয়টা অনেকটা এরকম ” ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার” দিয়ে একটি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো। হও বললে হয়ে যায়। কিভাবে ‘‘হও বললে হয়ে যায়’’ একটু দেখি।অধিদপ্তর থেকে তারা অর্ডারের মাধ্যমে বলেছেন অমুক তমুক বিদ্যালয়ে ৬ষ্ট শ্রেনী চালু করা হল, আর সাথে সাথে অটো সিস্টেমে চালু হয়ে গেল।পরের বছর ৭ম এবং এর পরের বছর ৮ম হয়ে যায়।কিছু কিছু বিদ্যালয়ে একটি শ্রেণি চালু করার মত শিক্ষক ও শ্রেণি কক্ষ হয়ত আছে। বাংলাদেশে এমন প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই যেখানে নতুন শ্রেনীকক্ষ নির্মাণ না করে আরো নতুন তিনটি শ্রেণি চালু করা সম্ভব। যেসব বিদ্যালয়ে ২০১৩ সালে ৬ষ্ট শ্রেণি চালু করা হয়েছিল; উচিৎ ছিল ঐ বছরই সেসব বিদ্যালয়ে নতুন শ্রেণিকক্ষ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া। এসব বিদ্যালয়গুলোতে জানামতে কোন শ্রেণিকক্ষ নির্মিত হয়নি। ফলে স্থানাভাবে শ্রেণি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া অনেকটা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি চালুর ক্ষেত্রে যেসব এলাকায় উচ্চ বিদ্যালয় নেই সেসব এলাকাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল যাতে দূরবর্তী এলাকার শিশুরা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়ার সুযোগ পায়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি চালু হওয়ায় পার্শ্ববর্তী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিনাবেতনে খরচবিহীন লেখাপড়া করার জন্য ৬ষ্ট শ্রেণিতে ভর্তি হতে চায়। পাশাপাশি শতভাগ উপবৃত্তি চালু করায় এসব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬ষ্ট থেকে অষ্টম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি হতে চায়। স্থান সংকুলানের কারণে ভর্তি না করতে চাইলে বিভিন্ন মহলের বিরাগভাজন হতে হয় শিক্ষকদের।পাশাপাশি এসব বিদ্যালয়ে মারাত্বক শিক্ষক সংকট চলছে।৬ষ্ট শ্রেণি চালু হবার আগে অধিকাংশ বিদ্যালয়ে শিক্ষক স্বল্পতার কারণে দুই শিফটে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালিত হত। কিন্তু ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তক অনেক বেশি ( পাঠ্য বিষয় ১৩ টি) হওয়ায় এদেরকে সকাল৯ঃ৩০ থেকে বিকাল ৪ঃ১৫ পর্যন্ত ক্লাস করাতে হচ্ছে।এখন পর্যন্ত এসব বিদ্যালয়ের জন্য কোন শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করা হয়নি। কোন বিবেচনায় এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষকের নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়নি বা পদ সৃষ্টির কোন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না তা একমাত্র উর্ধতন কর্তৃপক্ষই ভাল বলতে পারবেন। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেনির জন্য নির্ধারিত শিক্ষক দিয়ে কিভাবে আরো অতিরিক্ত ৩ টি শেণির শিক্ষা কার্যক্রম একইসাথে একই শিফটে পরিচালনা করা সম্ভব? এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এমন কোন দানবীয় গুণ বা অলৌকিক ক্ষমতা নেই যা তারা প্রদর্শন করে অতিরিক্ত ২৪টি ক্লাস প্রতিদিন করবে। ৮ম শ্রেণি চালুকৃত বিদ্যালয়ে প্রতিটি শ্রেণির জন্য কমপক্ষে ২ টি করে ৬ টি শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করা উচিৎ ছিল। ২০১৩ সাল থেকে ১০১৮ সাল, সময়ের অঙ্কে ৬ বছর কম সময় নয়।অদ্যাবধি এসব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের পদ সৃষ্টি করা হয়নি বা পদ সৃষ্টির কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কোন মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয়নি।৬ষ্ঠ, ৭ম এবং ৮ম শ্রেণির জন্য পাঠ্যবই ১৩টি।গণিত, ইংরেজি, বিজ্ঞান এবং তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ে পাঠদান করতে অবশ্যই বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক প্রয়োজন।জেনারেল শিক্ষক দিয়ে এসব বিষয় পাঠদান মোটেও সম্ভব নয়।এছাড়া, চারু কারু, ‍শারীরিক শিক্ষার মত বিষয়ের জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত শিক্ষক প্রয়োজন।কিন্তু কোন কিছু চিন্তা না করেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি চালু করা হয়েছে। এই হচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি চালুর করুণ অবস্থা।

১ম থেকে পঞ্চম শ্রেণির কারিকুলাম আর ৬ষ্ট থেকে অষ্টম শ্রেণির কারিকুলাম এক নয়। ৬ষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির কারিকুলামের সাথে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পরিচিত নয়।ষার কারণ প্রাথমিক শিক্ষা ও মাধ্যমিক শিক্ষার কারিকুলাম সর্ম্পূণ আলাদা। ৬ষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির কারিকুলামের সাথে শিক্ষকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ছিল। কিন্তু ২০১৩ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিগত ছয় বছরে এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য ৬ষ্ট থেকে ৮ম শ্রেণির কারিকুলাম ও শিখন শেখানো কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য কোন প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা হয়নি। কেন এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কোন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি? এই প্রশ্নের জবাব কে দেবে? অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য যেমন শিক্ষকদের প্রস্তুত করা হয়নি, তেমনি কর্তৃপক্ষের কোন পরিকল্পনা ছাড়াই এগিয়ে চলছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি চালু কার্যক্রম।এতেই প্রমাণিত হয় যে কোন পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি চালু করা হয়েছে। 

এসব বিদ্যালয়ে ২ জন বিএড প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক সংযুক্তি প্রদানে অধিদপ্তরের নির্দেশনা থাকলেও মাঠপর্যায়ের উপজেলা শিক্ষা অফিসগুলো এবং জেলা শিক্ষা অফিসগুলো তা মেনে চলছে না। উর্ধতন কর্তৃপক্ষ অধিদপ্তরে বসে অর্ডার দিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ করে ফেলছেন। আদেশ মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না তা দেখার কেহ নেই। যেসব বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি চালু রয়েছে সেখানে প্রথম শ্রেণির শিশুরা যে ডেস্ক বেঞ্চে বসে একই ডেস্ক বেঞ্চে বসে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা। বড় বাচ্চাদের জন্য উচু ডেস্ক বেঞ্চ দরকার। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব কোন ফান্ড নেই, আয়ও নেই।বড় বাচ্চাদের বসার এবং লেখার জন্য যে উচঁু ডেস্ক বেঞ্চ দরকার তা কি আর দেখার কেউ আছে? উঁচু ডেস্ক বেঞ্চ হয় সরকারের তরফ থেকে দেওয়া দরকার নতুবা এসব বিদ্যলয়কে নগদ অর্থ বরাদ্ধ দেওয়া দরকার। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই নির্মম।ছয় বছরেও এসব বিদ্যালয় কিছু পায়নি।প্রথম শ্রেণির শিশুর বেঞ্চে বসে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা পড়াশুনা করে যাচ্ছে।এভা্বেই খুড়িয়ে খুড়িয়ে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকরা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। 

যেকোন প্রতিষ্টান পরিচালনার জন্য অর্থের প্রয়োজন আছে।একটি বিদ্যালয়ে যখন নতুন তিনটি শ্রেনি বাড়ানো হল সাথে সাথে এই অতিরিক্ত শ্রেনীর জন্য অতিরিক্ত ব্যয় ও বাড়ছে। বই আনা, খাতাপত্র, শিক্ষা উপকরণসহ আনুষাঙ্গিক অনেক খরচ আছে।বিদ্যালয়গুলো এসব খরচ সংকুলানের জন্য কার দরজায় যাবে? মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের কাছে থেকে, সেসন ফি, বেতনসহ নামে বেনামে অনেক টাকা নেয় কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আয়ের কোন খাত নেই। অষ্টম শ্রেণি চালুকৃত বিদ্যালয়গুলোই কেবলমাত্র উপলব্ধি করতে পারছে তাদের সমস্যাগুলো। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, তাদের মনে্র অব্যক্ত কথাগুলো শুনার কেউ নাই, তাদের সমস্যাগুলো সমাধানের কেউ নেই। এই অবস্থায় প্রতি বছর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬ষ্ট শ্রেণি চালু হচ্ছে আর তিন বছরের মাথায় বিদ্যালয়গুলো অষ্টম শ্রেণিতে পরিণত হচ্ছে। সমস্যায় ধুকতে থাকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন করে সমস্যা সৃষ্টি কাম্য নয়। মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিষয় ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে নারী পুরুষ নির্বশেষে সবার জন্য স্নাতক ডিগ্রী নির্ধারণ করা, শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, বিদ্যালয় সার্বিক ব্যয় নির্বাহের জন্য বরাদ্ধ নিশ্চৎ করতে হবে । তবেই মান সম্মত প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নিশ্চত হবে।

লেখকঃ মোহাম্মদ আজাদ মিয়া, সহকারী শিক্ষক, থানাগঁাও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,

ওসমানীনগর, সিলেট।

Email: phehli@gmail.com

No comments:

Post a Comment

Post Bottom Ad

Pages