প্রাথমিক শিক্ষার মান ও কিছু সুপারিশ - জীবন গড়ি প্রযুক্তির সুরে ♫

Infotech Ad Top new

Infotech ad post page Top


প্রাথমিক শিক্ষার মান ও কিছু সুপারিশ

প্রাথমিক শিক্ষার মান ও কিছু সুপারিশ

Share This



মোহাম্মদ আজাদ মিয়া

প্রত্যেক সচেতন মা বাবার স্বপ্ন নিজ সন্তানকে একটি ভাল স্কুলে ভর্তি করানো। আর্থিকভাবে স্বচ্চল পরিবার হলে শুধুমাত্র বাচ্চাদের ভালো স্কুলে পড়ানোর জন্য তারা শহরে চলে যান। শহরের বিভিন্ন নামী দামি স্কুলে নিজের বাচ্চাকে ভর্তি করানোর জন্য যতরকম প্রচেষ্ঠা আছে তা তারা নিশ্চিত করেন। নিজের বাচ্চাদেরকে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য প্রতি মাসে হাজার হাজার টাকা ব্যয় করেন। শহরে যেমন ভাল স্কুল আছে, তেমনি আছে ভাল কোচিং সেন্টার। তাছাড়া ভাল মানের গৃহশিক্ষকও শহরে পাওয়া যায়। কিন্তু গ্রামে না আছে ভাল স্কুল, না আছে কোচিং সেন্টার, না আছে ভাল গৃহশিক্ষক। তাই তারা সদলবলে শহরমূখী। এই সুযোগে শহরের আনাচে কাঁনাচে গজিয়ে উঠছে বাংলাদেশের সবচেয়ে ভাল ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান! এসব শিক্ষালয়ে শুধু সরকার নির্ধারিত বোর্ডের বই-ই পড়ানো হয়না, পাশাপাশি আরো হরেক রকম বই গলাধঃকরণ করানো হয়। অনেক অভিভাবকের ধারণা টেক্সবুক বোর্ডের বই পড়ে বাচ্চারা তেমন কিছু শিখতে পারে না।
বিখ্যাত এসব বিদ্যালয়ে ৬+ বয়স হলেই প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া যায়না। প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হতে হলে এর আগে কোন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করতে হয়। ১ম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য ভর্তি পরীক্ষা দিতে হয়। ভর্তি পরীক্ষায় যে মানের প্রশ্ন আসে সেগুলোর উত্তর দিতে হলে ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত আগে পড়তে হবে। এসব ভাল স্কুলে ৬+ কোন শিশুকেই ১ম শ্রেণিতে দেখা যায়না। ্ভর্তি পরীক্ষা ছাড়া কোন অভিভাবক তাঁর বাচ্চাকে ভর্তি করাতে হলে প্লে শ্রেণিতে ভর্তি করাতে হবে। এখানে এক বছর পড়ার পর আসবে নার্সারী শ্রেণিতে। নার্সারীতে আরো এক বছর। তারপর যাবে শিশু শ্রেণিতে। শিশু শ্রেণির পর যাবে প্রথম শ্রেণিতে। প্রথম শ্রেণিতে উঠতে উঠতেই তিন বছর শেষ। তিন বছর পড়ে যারা প্রথম শ্রেণিতে আসে আর যারা কোন শ্রেণিতে না পড়েই প্রথম শেণিতে ভর্তি হয় তাদের মধ্যে তফাৎ থাকাটা স্বাভাবিক। দেখা গেছে নামধারী ভাল স্কুলের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীর বয়স এবং সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১ম শ্রেণির শিক্ষার্থীর বয়সেও অনেক তফাৎ থাকে। এসব ভাল স্কুলে শুধু শিক্ষার্থীরাই পড়েনা; সাথে সাথে তার অভিভাবকরাও পড়েন। একটা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এক একা বিদ্যালয়ে আসে এবং বাড়িতে যায়। কিন্তু নামী দামী বিদ্যালয়ের শিশুরা তার মা বাবার হাত ধরে বিদ্যালয়ে আসে এবং ফিরে যায়। অভিভাবকের কতটুকু অনাদর আর অবহেলায় গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের বাচ্চরা বেড়ে ওঠে তা প্রাইমারী স্কুলের সমালোচকরা কল্পনাও করতে পারেন না। অধিকাংশ প্রাইভেট স্কুল ছুটির পর শিক্ষকরা বিদ্যালয় কক্ষে প্রাইভেট পড়ান। বাসায় ফেরার পর আছে গৃহ শিক্ষক। এসব বিদ্যালয়ে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর থাকে একটি করে হোমওর্য়াকের ডায়রি। সেখানে শিক্ষকরা লিখে দেন আগামী দিনের পড়া যা শিক্ষার্থীরা পড়ে লিখে নিয়ে আসে পরের দিন। প্রতিদিন শিক্ষকরা হোমওর্য়াক দেখেন আর পরের দিনের ডায়রি লিখে দেন। এর বাহিরে শিখন-শেখানোর কোন কাজ বিদ্যালয়ে হয় না। শিশুরা প্রাইভেট শিক্ষক এবং গৃহশিক্ষককের কাছে পড়া শেখে। এত খাতির এবং আদর- যত্ন করা হয় যেসব শিশুদের, তারাই তো লেখাপড়ায় ভাল করবে।
সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই প্লে গ্রুপ বা নার্সারী শ্রেণি। আছে শুধু শিশু শ্রেণি তবে অধিকাংশ শিশু আছে যারা শিশু শ্রেণিতে না পড়েই সরাসরি প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়। ছয় বছরের আগে অধিকাংশ শিশু গ্রামের দূরবর্তী প্রাইমারী স্কুলে এক একা যেতে পারেনা। এখানে কোন মা বা বাবা শিশুদেরকে সাজিয়ে গুজিয়ে বিদ্যালয়ে পৌছে দেন না এবং ছুটির পর বাসায় নিয়ে যান না। বিদ্যালয়ের ছুটির পর প্রাইভেট শিক্ষক, কোচিং বা গৃহশিক্ষকের কাছে তারা পড়ে না। বেশিরভাগ মা বাবা লেখাপড়া জানেন না। ফলে বাসায় শিশুদের লেখাপড়া করতে সাহায্য করতে পারেন না। একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষা অর্জন নিশ্চিৎ করার জন্য প্রয়োজন শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অভিভাবকের সমস্বিত প্রচেষ্টা। শিক্ষার্থীরা বেশিরভাগ সময় তার পরিবারের সাথে থাকে। তাই শিক্ষার ক্ষেত্রে অভিভাবকরা বড় ভুমিকা পালন করতে পারেন নিঃসন্দেহে। কিন্তু সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৯৫% শিক্ষার্থীরা শিক্ষার ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধান থেকে বঞ্চিত কারণ তাদের অভিভাবকরা শিক্ষা সম্পর্কে অসচেতন।

বাংলাদেশে সরকারী যত প্রতিষ্ঠান আছে, প্রায় সবগুলোতেই জনবলের সংকট রয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোও শিক্ষক স্বল্পতায় ধুকছে। প্রায় প্রতিটি বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংখ্যা অথবা পদের সংখ্যা কম। অনেকেই অভিযোগ করেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষের চেয়ে স্কুলের অফিসরুমে বেশি স্বাচ্চন্দবোধ করেন। প্রকৃতপক্ষে ছোট একটা প্রাইমারী স্কুলের অফিসে এতবেশি দাপ্তরিক কাজ করতে হয় যা একজন প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক ছাড়া আর কেহ অনুমানই করতে পারবেন না। সারা বছরব্যাপী শিক্ষকরা শিক্ষাদানের চেয়ে অধিদপ্তরের বিভিন্ন নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। ষাট থেকে সত্তরটি রেজিষ্ট্রারী খাতা মেনটেন করতে হয়। বিদ্যালয়ের কাজের বাহিরে সরকারর বিভিন্ন দপ্তরের ভলান্টিয়ার হিসেবে বাধ্যতামূলক কাজ করতে হয়। এতসব কাজের ফাঁকে শিক্ষাদান কতটুকু ফলপ্রসূ হবে? অথচ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল কাজ হল কোমলমতি শিশুদের নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে উপরের নির্দেশ পালন করা মূল কাজ আজ শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা গৌণ কর্ম।
প্রতিটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রম মনিটরিং করার জন্য প্রতিটি ক্লাস্টারে ( ১৫/১৬ টি বিদ্যালয় নিয়ে একটি ক্লাস্টার) একজন করে সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারে পদ রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে ৪/৫ টি করে ক্লাস্টার চালাতে হয় একজন সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে। ফলে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারের মূল কাজ ক্লাস পর্যবেক্ষণ করা, শিখন-শেখানো কার্যক্রমে শিক্ষকদের কোন ঘাটতি পরিলক্ষিত হলে ফিডব্যাক দেওয়া, শিখন শেখানোর জন্য আপডেট নিয়ম, নীতি, পদ্ধতি শিক্ষকদের মধ্যে সরবরাহ করা এবং বিদ্যালয়ের সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রম মনিটরিং করা। এই পদে অভিজ্ঞ লোকদের নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। যারা শিক্ষাদানের সাথে জড়িত এবং শিখন শেখানোতে অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ তারাই এই পদেও যোগ্য। কিন্ত এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয় এমন লোকদের যাদের শিখন শেখানোর ক্ষেত্রে পূর্বতন কোন অভিজ্ঞতা নেই। বিষয়টা অনেকটা চিনির দামে শরবত কেনার মত। যদি প্রধান শিক্ষকদের মধ্য থেকে বিভাগীয় পরীক্ষার মাধ্যমে সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার/ সহকারী ইন্সট্রাক্টর নিয়োগ করা হত তবে প্রাথমিক শিক্ষার চেহারা পাল্টে যেত। বাস্তবে দেখা গেছে সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসাররা মাঠ পর্যায়ের শিখন শেখানো কার্যক্রম মনিটরিংয়ের চেয়ে শিক্ষা অফিসের দাপ্তরিক কার্যক্রম নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়। শিক্ষাক্ষেত্রে মূখ্যকাজ হয়ে গেছে গৌণ আর গৌণ কাজ হয়ে গেছে মূখ্য। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে প্রাথমিক শিক্ষার মান শুধু স্বপ্নই থাকবে, বাস্তবে এর প্রতিফলন দেখা যাবে না।
প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনের হাতে একাডেমিক সাইটের দায়িত্ব না থাকাই ভাল। উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে সহায়তা করার জন্য একজন সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার থাকলেই চলে। প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান্নোয়নের জন্য উপজেলা রিসোর্স সেন্টারগলো গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে পারে। প্রতিটি ক্লাস্টারের দায়িত্বে একজন সহকারী ইন্সট্রাক্টরের হাতে থাকলে শিক্ষার গুণগত মান নিঃসন্দেহে বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি ৫/৬ টি বিদ্যালয় নিয়ে একটি ক্লাস্টার গঠন করা উচিৎ। একজন সহকারী ইন্সট্রাক্টর প্রতিদিন কমপক্ষে ২টি বিদ্যালয়ের শিখন শেখানো কার্যক্রম মনিটরিং করা উচিৎ। যদি এরকম শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় তবে অন্যান্য যত সমস্যাই থাক না কেন শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে শতকরা আশি ভাগ সফলতা নিশ্চিৎ করা যাবে। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো নামমাত্র মনিটরিং হয়। যারা মনিটরিংয়ের দায়িত্বে আছেন তারা শ্রেণি কার্যক্রম কদাচিৎ দেখেন। শ্রেণি-কার্যক্রম দেখার মত দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা কতটুকু আছে তা-ও প্রশ্ন সাপেক্ষ। ১০/১৫ দিনের ট্রেনিং এর মাধ্যমে একজন সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারের চাকরি জীবন শুরু হয়। আর তিনি যাদের কার্যক্রম মনিটরিং করবেন তারা শিখন শেখানোর উপর এক থেকে দেড় বছরের প্রশিক্ষণ ( সিইএড/ডিপিএড) গ্রহণ করেন।
প্রায় সময় আমরা একটি বিষয় লক্ষ্য করি যে, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ শিক্ষকদের আগমন প্রস্থান নিয়ে বেশ কড়াকড়ি আরোপ করেন। কিন্তু আগমন প্রস্থান ঠিক হলেই শিক্ষার মান কাঙ্খিত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। উপযুক্ত শিখন শেখানো এবং শিক্ষা অর্জণ নির্ভর করে উপযুক্ত শিক্ষাদান পদ্ধতির উপর। সঠিক নিয়মে যদি শিশুদের নিকট পাঠ উপস্থাপিত হয় এবং শিক্ষার্থী কেন্দ্রিক শিখন শেখানো কার্যক্রম নিশ্চিৎ করা যায় তবে শিক্ষায় গুণগত পরিবর্তন আসবেই।
বেশিরভাগ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক অনুপাত ৬০ঃ১ বা আরো বেশি। পাশাপাশি বসার ব্যবস্থা ও অপ্রতুল। অধিকাংশক্ষেত্রে শিক্ষকদেরকে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত একটানা ক্লাস করতে হয়। একটানা ২/৩ টা ক্লাস করার পর শিক্ষক আর নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্লাস নিতে পারেন না। বাধ্য হয়ে নিজের খেয়াল খুশিমত পদ্ধতিতে ক্লাস করেন। এর ফলে ঠিকমত শিখনফল অর্জিত হয় না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিকট প্রিয় বিষয় হচ্ছে ট্রেডিশনাল সিস্টেমে শিক্ষাদান করা। সিইনএড, ডিপিএড, বিষয় ভিত্তিক প্রশিক্ষণসহ কোন প্রশিক্ষণই তাদের ধ্যান ধারণার পরিবর্তন ঘটাতে পারছেনা। এর পেছনে মূল কারণ হচ্ছে প্রি সার্ভিস প্রশিক্ষণ না থাকা। কোন প্রশিক্ষণ ছাড়াই আমাদের দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন। চাকরির ৪/৫ বছর পর সিইএড/ ডিপিএড প্রশিক্ষণের সুযোগ পান। প্রশিক্ষণে শিক্ষাদানের নতুন কলা কৌশল শিখলেও যা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায় তা আর ত্যাগ করা যায় না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যারা প্রথম নিয়োগ পান তারা বয়সে অধিকতর তরুণ। প্রথম প্রথম কাজ করতে করতেও তাদের কাজের স্পৃহা কমে না। কিন্তু ২/৩ বছর শিক্ষকতা করার পর আর সে উদ্যোম থাকেনা। বয়সের দিক দিয়ে তরুণ থাকলেও বেশিরভাগ শিক্ষকরা মনের দিক দিয়ে প্রৌঢ় হয়ে যান। কেমন যেন অলসতা মনে এবং শরীরে বাসা বাঁধে। কাজের প্রতি অনিহা চলে আসে। বিষয়টা অনেকটা মানসিক। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর একাধারে ৭/৮ ঘন্টা শিশুদের চেচামেচির মধ্যে থাকতে থাকতে শরীর ও মন অন্যরকম হয়ে যায়।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য একটা মেন্টাল ডিপ্রেশনের বিষয় হচ্ছে যুগের পর যুগ একই পদে কাজ করা। প্রমোশন নেই বললেই চলে। একসময় ছিল প্রাথমিক শিক্ষকদের নিয়োগের ক্ষেত্রে মহিলারা এসএসসি পাস এবং পুরুষরা স্নাতক পাস। সেটা এখন পরিবর্তন করে মহিলারা এইচএসসি এবং পুরুষরা স্নাতক পাস। একই পদ এবং একই বেতন কিন্তু যোগ্যতা ভিন্ন। ফলে এখানে একটা মানসিক দ্বন্দ্ব লেগেই আছে। দীর্ঘদিন চলে আসা এমন অসমতা শিক্ষার মানোন্নয়নে কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলছে। প্রাথমিক শিক্ষক পদ ছাড়া অন্য কোন চাকুরিতে এমন শিক্ষাগত যোগ্যতার নিয়োগ পদ্ধতির নজির নেই। শিক্ষা ব্যবস্থায় একই পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে লিঙ্গভেদে ভিন্ন ভিন্ন যোগ্যতা থাকা উচিৎ নয়। একটি অবহেলিত গোষ্ঠিকে মানবসেবায় সম্পৃক্ত করার জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কোটা সিস্টেম থাকতে পারে তবে সেটা যুগের পর যুগ অব্যাহত থাকতে পারেনা। আর থাকলেও সেটা সম যোগ্যতা হলে কোন প্রশ্ন ছিলনা। নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষক পদের জন্য স্নাতক হওয়া উচিৎ। পাশাপাশি সরাসরি প্রধান শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ করে বিভাগীয় পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্য সহকারী শিক্ষকদেরকে প্রধান শিক্ষক পদে পদায়ন করা উচিৎ।
বাংলাদেশে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সবচেয়ে বিরক্তিকর বিষয় হচ্ছে দীর্ঘ সময়সূচী। সকাল ৯ঃ০০ হতে বিকাল ৪ঃ৩০ পযন্ত প্রায় আট ঘন্টা শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। শিশুদের শারিরীক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা এবং চিত্তবিনোদনের প্রয়োজন। ১ঃ৩০ থেকে ২ঃ০০ পর্যন্ত টিফিন বিরতি। প্রায় সাত ঘন্টা সময় ছোট কোমলমতি শিশুদের শ্রেণিকক্ষে ধরে রাখা কতটুকু যৌক্তিক? শিখন শেখানোর সময় আরো কমিয়ে আনা উচিৎ। চার ঘন্টার বেশি শিখন শেখানোতে ব্যয় করা উচিৎ হবে না। বাকি সময়টুকু খেলাধূলা ও চিত্তবিনোদনের জন্য বরাদ্ধ করা হলে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ত্বরান্বিত হবে।
প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ঘন ঘন পরীক্ষা নিরীক্ষা চলে আমাদের দেশে। কোন নিয়ম বা পদ্ধতি স্থায়ী হয় না। যারা এসব নিয়ম নীতি প্রবর্তণ করেন তারা কেহ সরাসরি প্রাথমিক শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত নয়। প্রাথমিক শিক্ষা সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণী বিষয়ে শিক্ষকদের সম্পৃক্ত করা উচিৎ। তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। জোর করে যেকোন বিষয় গলাধঃকরণ করানোর চেষ্টা করা হলে বদহজম হয়ে যাবে। প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে কাঙিখত মানে নিতে হলে প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডার ব্যবস্থা চালু করতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার সর্বনিম্ন পদ হল সহকারী শিক্ষকের। সহকারী শিক্ষক পদকে এন্ট্রি পদ ধরে প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডার চালু করলে উচ্চ যোগ্যতা সম্পন্ন মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে চাইবে। যারা শিক্ষক তারাই যদি জেলা শিক্ষা অফিসার, বিভাগীয় উপপরিচালক, পরিচালক এবং মহাপরিচালক হতে পারে তবে প্রাথমিক শিক্ষায় গুণগত পরিবর্তন আসবেই। বর্তমানে বেশিরভাগ উর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রেষণে অন্য ডিপার্টমেন্ট থেকে এনে প্রাথমিক শিক্ষা ডিপার্টমেন্টকে চালানো হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষার অন্দরমহল পর্যন্ত যাদের নখদর্পণে তাদেরকে নিচে রেখে হায়ার করে লোক এনে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের বৃথা চেষ্টা চলছে যুগ যুগ ধরে। সত্যি সত্যি যদি আমরা প্রাথমিক শিক্ষার মান চাই তাহলে প্রেষণ ব্যবস্থা বন্ধ করে প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডার ব্যবস্থা প্রবর্তণ করতে হবে।
শিক্ষকদেরকে উপযুক্ত মর্যাদার আসনে আসীন করতে হবে। পাঠ্য বইয়ে ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতা একটা ছাপিয়ে দিলেই শিক্ষকের মর্যাদা নিশ্চিৎ হয়না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীরা কোন শ্রেণির নাগরিক সৃষ্টি করবে? শিক্ষকদের কোন শ্রেণি থাকতে পারেনা। আর যদি কোন শ্রেণিতেই তাদেরকে ফেলতে হয় তবে তা হবে প্রথম শ্রেণি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কেন বারবার নিজেদের মর্যাদার জন্য বিভিন্ন দপ্তর ও মন্ত্রনালয়ে যাবে? তাদের কথাগুলো শুনার কী কেহ নাই? প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করে দিতে হবে। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বিদেশে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, স্কলারশীপের সুযোগ পায়, কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সেই সুযোগ পায় না। প্রাথমিক শিক্ষকরা যাতে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে গবেষণা করতে পারে সেজন্য ‘‘প্রাথমিক শিক্ষা গবেষণা সেল’’ গঠন করতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষার মানের সাথে অনেকগুলো প্রভাবক কাজ করে। এখানে কোন কার্পণ্য করার সুযোগ নেই। একটি আদর্শবান জাতির বীজ রুপিত হয় যেখানে, সেখানে আসল সমস্যাগুলো সমাধান না করে যতই নীতিবাক্য আওড়ানো হোক না কেন ফলাফল অশানুরুপ আসবেনা।
লেখকঃ প্রাথমিক শিক্ষক ও কলাম লেখক
Phehli@gmail.com

No comments:

Post a Comment

Infotech Post Bottom Ad New

Pages